সহায়-সম্পদ বিক্রি করে বৈধভাবে এসে আজ সর্বস্বান্ত হয়ে শত শত শ্রমিক মালয়েশিয়ায় জেলের ঘানি টানছে। এদের অনেকের বৈধ ভিসা ও কাগজপত্র থাকার পরও এখন তারা বিচারের মুখোমুখি। মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন আইনে ওরা অপরাধী। কারণ কোনও শ্রমিক চুক্তিবদ্ধ কোম্পানি বা সেক্টর পরিবর্তন করলে তাকে জেল-জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়। কুয়ালালামপুরস্থ সুংগাই বুলো জেলখানা থেকে ডাকাতির মামলায় ৩ বছর পর বেকসুর খালাসপ্রাপ্ত জনৈক বাংলাদেশী এ প্রতিবেদককে জানান, জেলে আটক বেশিরভাগ শ্রমিকই রয়েছে বৈধ ভিসাধারী। উল্লিখিত অপরাধে তারা আটক রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ওভারস্টে হয়ে যাওয়া শ্রমিক, বৈধ কোনও কাগজপত্র না থাকা শ্রমিক, ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে চাকরিরত থাকা শ্রমিক ও জাল ভিসায় আটক শ্রমিক। জাল ভিসায় আটক শ্রমিকরা নিজেরাও জানত না তার ভিসাটি জাল। এজেন্সিকে বিশ্বাস করে টাকা-পয়সা দিয়ে যে ভিসা সে করেছে সেই জাল ভিসা নিয়ে পথে বের হয়ে পুলিশের কাছে ধরা পড়ে বহু শ্রমিক এদেশের বিভিন্ন জেলে আটক রয়েছে। তাদের অনেকেই আবার দেশে যাওয়ার পথে এয়ারপোর্ট থেকে আটক হয়। বিভিন্ন ক্যাটাগরির এই শ্রমিকদের সবাইকেই কমবেশি সাজা ভোগ করতে হচ্ছে এবং সাজা পেতে হবে। মানবিক দিক বিবেচনা করে আদালত সাজার মেয়াদ সাধারণত ৫/৬ মাস ধার্য করে থাকেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ শ্রমিককে আইনানুসারে ২টি করে বেত্রাঘাতও দেয়া হয়। এরকম বহু শ্রমিক জেলে আটক রয়েছে, যারা আড়াই লাখ টাকা খরচ করে এসে ৫০ হাজার টাকাও দেশে পাঠাতে পারেনি। অথচ তার আগেই অবৈধ হয়ে জেলের ঘানি টানছে। জেলের সাজা ভোগ শেষ হলে হতভাগ্যদের স্থান হবে
ইমিগ্রেশন ডিটেনশন ক্যাম্প। এরপর টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারলেই তবে দেশে ফেরত যাওয়ার সুযোগ হবে। বাংলাদেশে এই হতভাগ্যদের বহু আত্মীয়স্বজন জানে না তারা মালয়েশিয়ার জেলে আটক রয়েছে।
ইমিগ্রেশন ডিটেনশন ক্যাম্প। এরপর টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারলেই তবে দেশে ফেরত যাওয়ার সুযোগ হবে। বাংলাদেশে এই হতভাগ্যদের বহু আত্মীয়স্বজন জানে না তারা মালয়েশিয়ার জেলে আটক রয়েছে।
বরাবরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিকের চাহিদা ও সুনাম থাকার পরও কতগুলো কারণে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের ফ্রিজ না খোলার কিছু কারণও রয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দাভাব তার প্রধান কারণ। অন্যতম কারণ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় জনসংখ্যানুপাতিক হিসাবে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিক সংখ্যা অনেক বেশি। ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ‘আসিয়ান’ভুক্ত দেশগুলোরও দাবি রয়েছে। যার মধ্যে বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়া অন্যতম। স্বল্পমূল্যে বাংলাদেশী শ্রমিক লাভের কারণে স্থানীয় শ্রমিকরা মালিকের কাছে অনেকটা উপেক্ষিত সবসময়। কারণ যেখানে একজন বাংলাদেশী শ্রমিক ওভারটাইমসহ ৭/৮শ’ রিঙ্গিত বা তার কম পায় সেখানে ওভারটাইম ছাড়াই ৮/৯শ’ রিঙ্গিতেও স্থানীয় শ্রমিকদের পোষায় না। তার ওপর স্থানীয় শ্রমিকদের আরও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশী শ্রমিকদের মালিক যেভাবে খুশি সেভাবেই ব্যবহার করার সুযোগ পায়। এতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কদর বাড়লেও কমে স্থানীয় শ্রমিকের চাহিদা। এতে স্থানীয় শ্রমিক সংগঠন এমটিইউসি (মালয়েশিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস)’র সবসময় চাপ থাকে সরকারের ওপর। বিভিন্ন সময় মালয়েশিয়ার অন্যতম অভিযোগ, বাংলাদেশী বাজার চালু হলে এদেশের প্রশাসনে দুর্নীতি বিস্তারের অপচেষ্টা করা হয়। এ অভিযোগটা অবশ্য অনেকাংশেই সত্য। সর্বোপরি কথা রাখে না বাংলাদেশ সরকার। কারণ মালয়েশিয়া সরকার বারবার অল্প খরচে শ্রমিক পাঠানোর প্রস্তাব করার পরও নির্ধারিত হারের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকায় এজেন্সিগুলো শ্রমিক পাঠিয়েছে। মালয়েশিয়া এসে শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন, এয়ারপোর্টে পড়ে থাকা ইত্যাদি ঘটনায় লজ্জিত হয়েছে মালয়েশিয়া। বিশ্বে মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে। অতএব সিদ্ধান্ত হয় ফ্রিজ।
মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবে এখন এটা স্পষ্ট যে, আটকে পড়া ৫৫ হাজার কাজ পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে। মালয়েশিয়ার মনোভাব পরিবর্তন না হওয়ায় এই কাজের ভবিষ্যৎ আশার আলোটুকুও প্রায় উবে গেছে। গত মার্চ মাসে ওই কাজ বাতিল করে দেয়ার পরই অবশ্য মালিকদের বলা হয়েছিল প্রদত্ত লেভির টাকা উঠিয়ে নিতে। এতে বহু মালিক আগেই তাদের শ্রমিক আমদানির বিপরীতে জমা দেয়া লেভির টাকা তুলে নিয়েছে। কিন্তু আসলে সে টাকা কার? মালিকের নামে দেয়া বাংলাদেশীদেরই টাকা। আর এজেন্টকে দেয়া বাংলাদেশের গরিব মানুষগুলোর টাকা। তবু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা মালয়েশিয়া সরকারের মুখের দিকে তাকিয়েছিল দিনের পর দিন, যদি একবার দয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে মালয়েশিয়ায় সরকার বদলের পরপরই ধারণা করা হয়েছিল যে, ওই ৫৫ হাজারের স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়েই থাকবে। কারণ যিনি বন্ধ করে গেছেন তিনি ক্ষমতায় নেই। বন্ধ ঘরের চাবি যে ছিল তার হাতেই।
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার চালু হচ্ছে না। এ সংবাদে বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের পরিবারে হয়তো অর্থশোকের মাতম হবে। মালয়েশিয়া শ্রমবাজার কতদিন বন্ধ থাকবে? এ প্রশ্নের কোনও জবাব কেউ জানে না। তবে বিভিন্ন বিচার বিশে¬ষণে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ৫ বছরের আগে তো আর আশা করার সুযোগ নেই। মালয়েশিয়া প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবে ৫৫ হাজার কাজে আটকে থাকা বিনিয়োগের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখে বহু আদম বেপারি ও দালালদের মাথায় হাত পড়েছে। কারণ পুরো লভ্যাংশ বা বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে অগ্রিম নেয়া অর্থের কোনও ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে না। অনেকে মালয়েশিয়া আগমনেচ্ছুকদের কাছ থেকে টাকা নেয়ায় ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এখন দেশে যেতে পারছেন না। বাড়িঘর মানসম্মান যাচ্ছে। দালালদের মাঝে দেখা দিয়েছে অজানা আতঙ্ক। তাদের এখন কি উপায় হবে সেটাই তারা ভাবছেন। এক্ষেত্রে বড় দালালরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারলেও ছোট বা মাঝারি দালালদের অবস্থা খুবই নাজুক। অনেকে বেশি টাকার লোভে কোম্পানির শ্রমিক থেকে দালালের খাতায় নাম লিখিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এরই নাম আদম ব্যবসা। শ্রমবাজারের নামে জুয়া খেলা। লাগলে বাদশা, না লাগলে ফকির। এদিকে নতুনভাবে শ্রমিক আসা বন্ধ থাকায় মালয়েশিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক উল্লাস লক্ষ্য করা গেছে। তাদের অনেকের মন্তব্য। আল্লাহ উচিত বিচার করেছেন। নতুনভাবে শ্রমিক না এলে এখন মালিকরা কর্মরত শ্রমিকদের ওপর বহুলাংশে নির্ভর হতে বাধ্য। এতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি, সুযোগ-সুবিধা বাড়তে পারে। শ্রমিকদেরও মূল্যায়ন ও সমাদর বাড়াতে বাধ্য হবেন মালিকরা। - গৌতম রায়, মালয়েশিয়া থেকে।



0 মন্তব্য(সমূহ):
Post a Comment